চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আদ্যোপান্ত

সেই ১৯৯৮ সালে ঢাকার মাঠে শুরু হয়েছিলো আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। সেসময় মিনি বিশ্বকাপ নামেই পরিচিত ছিলো এই আসর। এ নিয়ে অষ্টমবারের মতো আয়োজিত হবে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। প্রথম পাচটি আসর দুই বছর পরপর হলেও, সবশেষ দুটি আসর থেকে চার বছরের ব্যবধান রাখা হয়েছে।

প্রস্তুত বর্তমানে ওয়ানডে ক্রিকেটের সেরা আটটি দল। তাদের লড়াই সেরাদের সেরা হওয়া। ম্যানচেস্টারে সন্ত্রাসী হামলার পরও দমে যায়নি আইসিসি। সন্ত্রাসের কাছে হার মানেনি ক্রিকেটও। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে এখন ইংল্যান্ডে আটটি দলই।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ভেন্যু এবার তিনটি। লন্ডনের দ্য ওভাল, বার্মিংহামের এজবাস্টন ক্রিকেট গ্রাউন্ড এবং কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন্স। ওভালের দর্শক ধারণক্ষমতা সাড়ে ২৪ হাজার, এজবাস্টনের সাড়ে ২৫ হাজার এবং সোফিয়া গার্ডেন্সের ১৫ হাজার ৬শ ৪৩ জন।

রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে আটটি দল দুইভাগে খেলবে গ্রুপপর্ব। গ্রুপের সেরা দুটি দল উঠবে সেমিফাইনালে। গ্রুপ এ তে আছে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ড। গ্রুপ বি তে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা।

পহেলা জুন উদ্বোধনী ম্যাচ খেলবে স্বাগতিক ইংল্যান্ড আর বাংলাদেশ। এই ম্যাচের টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে অনেক আগেই। টুর্নামেন্ট শুরুর এক সপ্তাহ আগে ১৫ ম্যাচের আটটিরই সব টিকিট বিক্রি শেষ। মোট টিকিটের ৮৮ ভাগই বিক্রি হয়ে হয়ে গেছে অগ্রিম।

টুর্নামেন্টকে আকর্ষণীয় করতে এবার ব্যবহার করা হবে উচ্চমানের নানা ধরণের প্রযুক্তি। স্পাইডারক্যামের সাথে থাকছে প্লেয়ার ট্র্যাকিং ক্যামেরা, হক আইয়ের নতুন ভার্সন, স্টাম্পের সামনে এবং পেছনে রিভার্স ভিউ ক্যামেরা। ভেন্যুগুলোর গ্যালারিতে দর্শকদের জন্য থাকবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ওয়াইফাই।

এগারো বছর পর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ফিরছে বাংলাদেশ। ২০০৬ সালের পর টুর্নামেন্টটি ওয়ানডে র‌্যাংকিং-এর সেরা আট দলের করে ফেলে আইসিসি। সে কারণেই মাঝের দুটি আসরে ছিলো না টাইগাররা। এবার জায়গা করে নিয়েছে সেরা আট দলের একটি হিসেবেই।

কঠিন গ্রুপে পড়লেও বাংলাদেশের মনকাড়া পারফরম্যান্স দেখতে মুখিয়ে আছে টাইগার ভক্তরা। মাশরাফি-তামিমদের দিকে তাকিয়ে থাকবে ক্রিকেট বিশ্বের অন্যরাও। টাইগারদের উন্নতির গ্রাফের সূচকটা উর্ধ্বমুখী বোলেই তাদের উপর প্রত্যাশা বেড়েছে।

প্রত্যাশার চাপ নিতে বাংলাদেশ দল যে তৈরি, তার প্রমাণ গেলো সপ্তাহে আয়ারল্যান্ডে শেষ হওয়া ত্রিদেশীয় সিরিজ। শিরোপা জিততে না পারলেও, আয়ারল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো আইসিসির  ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে ছয় নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

এবারের আসরে বেশ কজন তরুণ ক্রিকেটারের উপর নজর থাকবে সবার। তাদের ভেতর সম্ভবত সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত নাম মোস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশের ২১ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার ইতোমধ্যেই বিশ্বতারকা। ইনজুরি থেকে ফিরে কিছুটা ছন্দহীন ছিলেন। তবে ত্রিদেশীয় সিরিজে দেখা গেছে পুরনো ফিজকে। মাত্র ১৮ ওয়ানডেতে ৪৩ উইকেট পাওয়া কাটার মাস্টারের দিকে তাকিয়ে থাকবে পুরো বাংলাদেশ।

এবার একটু পেছনে ফেরা যাক। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির যাত্রা শুরু ঢাকায়, ১৯৯৮ সালে। তখন নাম ছিলো আইসিসি নকআউট টুর্নামেন্ট। তাতে অংশ নেয় তখনকার টেস্ট খেলুড়ে ৯টি দেশ। ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় দক্ষিণ আফ্রিকা।

দু বছর পর পরের আসর বসে নাইরোবিতে। এ আসরে আমন্ত্রণ জানানো হয় টেস্ট ক্রিকেটের নতুন সদস্য বাংলাদেশ ও স্বাগতিক কেনিয়াকে। টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা ভারত ফাইনালে হেরে যায় মূলত ক্রিস কেয়ার্নসের কাছে। চ্যাম্পিয়ন হয় নিউজিল্যান্ড।

দু বছর পর তৃতীয় আসরে টুর্নামেন্টের নাম পাল্টে হয় আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। দল অংশ নেয় ১২টি। শ্রীলঙ্কায় সেবার ক্রিকেট বিশ্ব পরিচিত হয় বীরেন্দর শেবাগ নামের এক মারকুটে ব্যাটসম্যানের সঙ্গে। ফাইনালে ওঠে শ্রীলঙ্কা আর ভারত। বৃষ্টিতে ভেসে যায় ফাইনাল এবং রিজার্ভ ডে-ও। যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয় দু দলকে।

২০০৪ আসর বসে ইংল্যান্ডে। ১২ দলের টুর্নামেন্টে ওয়ানডে অভিষেক হয় যুক্তরাষ্ট্রের। নাটকীয় ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে দুই উইকেটে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

২০০৬ আসরের আয়োজক ভারত। সেবার পরিবর্তন আনা হয় ফরম্যাটে। ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে সেরা ছয় দল খেলে সরাসরি। বাকী চার টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে কোয়ালিফাইং রাউন্ড থেকে চূড়ান্ত পর্বে ওঠে শ্রীলঙ্কা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফাইনালে ক্যারিবীয়দের আট উইকেটে হারিয়ে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতে অস্ট্রেলিয়া।

পরের আসরের আয়োজক ছিলো পাকিস্তান। কিন্তু নিরাপত্তা ইস্যুতে বেশিরভাগ দল পাকিস্তানে খেলতে যেতে রাজি না হওয়ায় টুর্নামেন্ট পিছিয়ে যায় এক বছর। ২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় হওয়া আসরে শিরোপা ধরে রাখে অস্ট্রেলিয়া। ফাইনালে তারা হারায় নিউজিল্যান্ডকে।

সবশেষ আসরটি হয়েছে ইংল্যান্ডে। রের মাঠে এবারো ফাইনালে ব্যর্থ হয় ইংল্যান্ড। দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। এই শিরোপা জিতে অনন্য এক ইতিহাস গড়েন মহেন্দ্র সিং ধোনি। হিসেবে আইসিসির বড় তিনটি টুর্নামেন্টের ট্রফি জেতা একমাত্র অধিনায়ক হয়ে যান ধোনি।

 

এবারের আসরে নেই একবারের চ্যাম্পিয়ন এবং দুবারের রানার আপ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্রিস গেইলকে নিশ্চয় মিস করবেন ভক্তরা। গেইলের জন্য চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খুবই পয়া একটি টুর্নামেন্ট। ৭৯১ রান নিয়ে রান সংগ্রাহকের তালিকায় সবার উপরে আছেন মারকুটে এই ক্যারিবিয় ওপেনার।

সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি খেলেছেন নাথান অ্যাস্টল। ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ১৪৫ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন তিনি।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলার কোন বড় তারকা নয়। ১৫ ম্যাচে ২৮ উইকেট নিয়ে রেকর্ডটি নিউজিল্যান্ডের সাবেক মিডিয়াম পেসার কাইল মিলসের দখলে।

মিলসকে ছাড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে শ্রীলঙ্কান পেসার লাসিথ মালিঙ্গার। বর্তমানে খেলছেন, এমন বোলারদের মধ্যে মিলসের কাছাকাছি আছেন কেবলই মালিঙ্গা। ১৩ ম্যাচে ২২ উইকেট এই লঙ্কান পেসারের।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারত। অথচ আইসিসির নতুন অর্থনৈতিক মডেলের বিপক্ষে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ক্রিকেট বিশ্বের দাপুটে এই শক্তি এবারের আসরে খেলবে কীনা, সে ব্যাপারে দেখা দিয়েছিলো সংশয়। শেষ পর্যন্ত শচীন-দ্রাবিড়দের মতো সাবেক তারকাদের পরামর্শে টুর্নামেন্টে খেলার জন্য দল পাঠিয়েছে বিসিসিআই।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন